মহামারি করোনাভাইরাসে ইতোমধ্যে সাত লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় দুই কোটি। করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারে দুনিয়ার তাবৎ বিজ্ঞানীরা দিনরাত পরিশ্রম করে চলেছেন। কয়েকডজন প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারে অনেক দূর এগিয়েছে।

তবে সবার আগেই করোনার সফল ভ্যাকসিন বাজারে নিয়ে আসছে রাশিয়া। আগামী ১২ আগস্ট রাশিয়ার গামালেই ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি অ্যান্ড মাইক্রোবায়োলজি এ ভ্যাকসিন বাজারজাত শুরু করবে।

শনিবার (০৮ আগস্ট) রুশ সংবাদমাধ্যম দ্য মস্কো টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, আগামী ১২ আগস্ট বাজারে চলে আসবে বিশ্বের প্রথম করোনার ভ্যাকসিন। ইতোমধ্যেই বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে করোনা ভ্যাকসিনের হিউম্যান ট্রায়াল পর্ব শেষ করে ফেলেছে রাশিয়া। মস্কো টাইমস ছাড়াও ইকোনোমিক টাইমস, এক্সপ্রেস ফার্মা, টাইমস অব ইন্ডিয়া ও বিজনেস টুডেসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এ খবর প্রকাশ করা হয়েছে।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১,৬০০ জন স্বেচ্ছাসেবকের ওপর এই টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে। ট্রায়ালে দেখা গেছে, এই টিকা করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে সক্ষম হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবীদের শরীরেও এই টিকার প্রয়োগে কোনও রকম পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া বা সমস্যা দেখা দেয়নি।  রাশিয়ার শিল্পমন্ত্রী ডেনিস মন্তুরভ জানান, সেপ্টেম্বর থেকেই এই টিকার উৎপাদনের গতি আরও বাড়ানো হবে।

গত সপ্তাহে রুশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী মিখাইল মুরশকো জানান, সামনের মাসেই বাজারে টিকা ছাড়ার আদেশ ইতোমধ্যে জারি হয়ে গেছে। দ্রত গতিতে চলছে টিকা উৎপাদনের কাজ। এ বছরের মধ্যেই সাড়ে ৪ কোটিরও বেশি পরিমাণ প্রতিষেধকের ডোজ তৈরি করতে পারবে রাশিয়া। তবে প্রতিষেধক উৎপাদনের পাশাপাশি চলবে এটির তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালও।

গত মঙ্গলবারই WHO-এর মুখপাত্র খ্রিশ্চিয়ান লিন্ডমিয়ার বৃহত্তর ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে রাশিয়াকে টিকা তৈরির ক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি, প্রতিষ্ঠিত সুরক্ষা বিষয়ক সমস্ত নিয়ম-কানুন মেনে চলার অনুরোধ জানান। মার্কিন অ্যালার্জি এবং সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. অ্যান্থনি ফৌসি রাশিয়ার তৈরি করোনা প্রতিষেধকের সুরক্ষা, কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তবে সমস্ত জল্পনা, বিতর্ক উড়িয়ে গামালেই ইনস্টিটিউটের তৈরি করোনার টিকা আগামী ১২ অগাস্টই বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্তে অনড় রাশিয়া।

পুতিনের টিকা প্রথম শরীরে নিতে চান মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট

রাশিয়ার কাছ থেকে করোনাভাইরাসের টিকা নেয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ ওব্রাদর। এবং টিকা প্রথম যেসব স্বেচ্ছাসেবীর শরীরে প্রথম প্রয়োগ করা হবে তাদের মধ্যে  প্রথম হতে চান তিনি। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানায়।

দুই মাসেরও কম সময়ে টিকার অনুমোদন দেয়ার রাশিয়ার সমালোচনা করছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। এই টিকার কার্যকরিতা এবং পশ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।  প্রথম ব্যাচের টিকা কেবল ১০ শতাংশ ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা সফল হয়েছে। তবুও রাশিয়া এটিকে অনুমোদন দেয়ায় প্রশ্ন তুলেছে খোদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও।

তারা বলছে, তথ্য উপাত্ত ছাড়া এই টিকা গ্রহণ করা কঠিন। কিছু গবেষক বলছেন, তাঁরা আশঙ্কা করছেন, নিরাপত্তার কথা বিবেচনা না করে কেবল সম্মানের দিক বিবেচনাতেই রাশিয়া টিকার অনুমোদন দিয়েছে। এটি ভ্যাকসিন রাজনীতি বলেও অভিহিত করেছেন অনেকে।

কিন্তু মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট তার নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন বলেন, ‘আমিই প্রথম টিকাটি গ্রহণ করব।’ এর আগে পুতিন টিকার অনুমোদন দিয়ে বলেছিলেন, ‘এটি নিরাপদ। আমার মেয়ের শেরীরের প্রয়োগ করা হয়েছে। প্রথমে তার শরীরের তাপমাত্র বেড়ে যায় পরে ঠিক হয়ে যায় এবং সে সুস্থ হয়েছে।

মেক্সিকোর ডেপুটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্থা ডেলগাদো বলেন, তাঁর দেশের ২০ কোটি ডোজ টিকা প্রয়োজন হবে। যদি তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা সফল হয়, তবে আগামী বছরের এপ্রিল থেকে টিকা পাওয়া যাবে। মেক্সিকোতে ৫ লাখ ২২ হাজার ১৬২ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে আর মারা গেছে ৫৬ হাজার ৭৫৭ জন।

রাশিয়া বলছে, তারা যে টিকা তৈরি করেছে এবং উৎপাদন পর্যায়ে গেছে, তা এ মাসের শেষ দিকে সরবরাহ শুরু হবে। তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা শেষ না হলেও রুশ কর্মকর্তারা বলেছেন, টিকাটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এটি মানবদেহে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাও গড়ে তুলতে পেরেছে। টিকাটি উদ্ভাবন করেছে রুশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান গামালিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট। সহযোগিতা করেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

টিকাটির কার্যকারিতা পরীক্ষার ক্ষেত্রে তৃতীয় ধাপের মানবপরীক্ষা যেখানে হাজারো স্বেচ্ছাসেবীর ওপর প্রয়োগ করা হয়, তা অনুসরণ করা হয়নি। নিয়ন্ত্রকদের কাছ থেকে নিরাপদ টিকার অনুমোদন পেতে হলে এ পরীক্ষাকে প্রয়োজনীয় বলে ধরা হয়। রাশিয়ার টিকা অনুমোদন পেলেও এর বিস্তৃত পরীক্ষা হয়নি বলে তাদের দাবি সম্পর্কে গবেষকেরা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। বিশ্বজুড়ে রাশিয়ার টিকার বিষয়টি মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেয়েছে।

গামেলিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান আলেক্সান্ডার গিনটসবার্গ বলেছেন, কয়েক দশকের পুরোনো ব্যাপক গবেষণালব্ধ বৈজ্ঞানিক প্ল্যাটফর্মের ভিত্তিতে টিকাটি তৈরি। টিকাটির নাম ‘গাম-কোভিড-ভ্যাক’। দীর্ঘ মেয়াদে সুরক্ষা পেতে টিকাটির দুটি ডোজ ইনজেকশনের মাধ্যমে পুশ করতে হয়। টিকার দুটি ডোজের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে এতে ব্যবহৃত অ্যাডেনোভাইরাস, যা শরীরের কোষে টিকাটি পৌঁছায়। সর্বোচ্চ কার্যকারিতা পেতে দুই বা তিন সপ্তাহের ব্যবধানে দুটি ডোজ দিতে হয়।

টিকাটির নির্দেশিকায় বলা হচ্ছে, এটি ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের জন্য উপযুক্ত এবং অন্য অ্যান্টিজেনের সঙ্গেও দেওয়া যাবে। টিকাগ্রহীতাকে চিকিৎসকেরা পর্যবেক্ষণ করবেন এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তাঁরা শরীরের অবস্থা সম্পর্কে তথ্য জানাবেন। সম্ভাব্য কোনো জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।